বিশেষ প্রতিনিধি, Akther Hossan Saddam।।
আওয়ামীলীগের আমলে ছিলেন শেখ হাসিনা পরিবারের ঘনিষ্ট। এই পরিচয়ে সুযোগ-সুবিধা নিয়ে গড়েছেন বিশাল সাম্রাজ্য লাবিব গ্রুপের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আলমগীর। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপির এক কেন্দ্রীয় তরুণ নেতার শেল্টারে এখনও দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। শেখ পরিবারের অন্যতম এই সহযোগী এবার বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীও ছিলেন। সর্বশেষ তা না জুটলেও স্বতন্ত্র হয়ে টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখীপুর) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচন করছেন তিনি। বিএনপির ছায়া পেতে মরিয়া সালাউদ্দিন আলমগীরের ইস্যুতে দলটির স্থানীয় রাজনীতিতে কোন্দল জিইয়ে রেখেছেন বিএনপির ওই কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতা। শেখ পরিবারের মালিকানাধীন মধুমতি ব্যাংকের পরিচালক সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে দুর্নীতি, অর্থপাচারসহ একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। এতোকিছুর পরও বহাল তবিয়তে আছেন তিনি। যার সহযোগী বিএনপির বহিস্কৃত ও বিতর্কিত কয়েকজন নেতা। তার বিরুদ্ধের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও তদন্তের কোনো অগ্রগতি নেই।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে অনুমোদিত নয়টি চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকের মধ্যে শেখ পরিবারের সদস্যদের ভাগে পড়ে মধুমতি ব্যাংক লিমিটেড। শেখ হাসিনার ভাইপো শেখ ফজলে নূর তাপসের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠায় অন্যতম ভূমিকা রাখেন তার সহযোগী লাবিব গ্রুপের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আলমগীর। ব্যাংকিং খাতে আওয়ামী পরিবারের বীজ থেকে তৈরি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত মধুমতি ব্যাংকের পরিচালক হন তিনি। ব্যাংকটির দুই কোটি ৩২ লাখেরও বেশি শেয়ারের মালিকানা নিয়ে পরিচালক হন তাপসের অন্যতম এই সহযোগী। গণঅভ্যুত্থানের ব্যাংকের নিয়ন্ত্রকরা পালিয়ে গেলেও এখনও বহাল তবিয়তে আছেন তাপসের অন্যতম সহযোগী সালাউদ্দিন। তাদের হয়ে সবকিছু দেখভাল করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, আওয়ামীলীগের আশীর্বাদে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এর সহ-সভাপতি হন। তাপসের ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে আওয়ামী আমলের গত ১৫ বছর উন্নতির শিখরে পৌঁছেছেন তিনি। ব্যবসা-বাণিজ্য সংগঠন কেন্দ্রীক প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের ঘনিষ্ট হওয়ায় একাধিকবার তার সফর সঙ্গীও হয়েছেন। মোট কথা তাপসের সহযোগী হিসেব দাপটের সঙ্গে চলেছেন পুরো আওয়ামী আমল। হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। পোশাক খাত থেকে শুরু করে অ্যাগ্রো, আইটি, মৎস, প্যাকেজিংসহ ১৪টিরও বেশি শিল্প কারখানা হয়েছে আওয়ামীলীগের ছত্রছায়ায়। নিজের ও পাশাপাশি স্ত্রীকেও নিয়ে গেছেন সিআইপি মর্যাদায়। কিন্তু পাঁচ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর রাতা-রাতি বিএনপি বনে যাওয়ার চেষ্টা করেন। শত শত কোটি টাকার সম্পদ ও ব্যবসায় টিকিয়ে রাখতে পাল্টেছেন খোলস।
সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে দুদকে। এক লিখিত অভিযোগে বলা হয়, “মো. সালাউদ্দিন আলমগীরের (রাসেল) আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ অর্জন, কর ফার্কি, আমদানি রপ্তানির নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। অভিযুক্ত একজন অর্থ পাচারকারী। তিনি নিজ নামে বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি অবৈধ পন্থায় ও অসৎ উপায় অবলম্বন করে নামে-বেনামে শত শত কোটি টাকার ও অর্থের সম্পদের মালিক হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি অবৈধ ভাবে শত শত কোটি টাকার মালিক ও বিভিন্ন জায়গা জমি, ফ্ল্যাট ও রির্সোট শপিং মহলের মালিক হয়েছেন। অনেক অর্থ হুন্ডি ও বিভিন্ন উপায়ে দুবাই, কানাডা, মালেশিয়া, আমেরিকা, সহ আরো একাধিক দেশের বাইরে অর্থ পাচার করে বিদেশেও অঢেল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন।”
টাঙ্গাইলের স্থানীয় সূত্রের তথ্যমতে, তার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের পরও তাপস ও শেখ পরিবারকে টাকা পাঠানোর অভিযোগ আছে। সফট আওয়ামীলীগ পুনর্বাসন প্রকল্পের অংশ হিসেবে তাকে নির্বাচনে দাঁড় করানো হয়েছে তাপসের মতামত অনুযায়ী। শুরুতে শিল্পপতি পরিচয় ব্যবহার করে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। শেল্টার দিয়েছেন ওই অঞ্চল থেকে উঠে আসা বিএনপির এক কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী তরুণ নেতা। যদিও এই আসনে দলটির প্রার্থী বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান। কিন্তু স্থানীয় কিছু ইস্যুতে টাকা ছড়িয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাড়িয়ে এর সুবিধা নিচ্ছে বলেও অভিযোগ আছে।
স্থানীয়রা জানান, আওয়ামী সমর্থকদের পাশাপাশি বিএনপির স্থানীয় বহিস্কৃত ও বিতর্কিত নেতারা সালাউদ্দিনের জন্য নির্বাচনী মাঠে কাজ করছেন। যাদের মধ্যে অন্যতম সাবেক যুবদল নেতা ফজলুল হক বাচ্চু, বহিস্কৃত বিএনপি নেতা নাছির উদ্দিন, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা শেখ জাহাঙ্গীর আলম। বাচ্চু দীর্ঘদিন ধরে সখিপুরে সালাউদ্দিন আলমগীরের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। সালাউদ্দিনের মালিকানাধীন লাবিব গ্রুপের প্রতিনিধি হিসেবে সখিপুরে জবরদস্তি করে জমি দখল, কৃষি জমি ভরাটের অভিযোগ এনে বাচ্চুর বিরুদ্ধে চার বছর মানববন্ধন করেছিলেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা। সবমিলে বিতর্কিতদের নিয়ে মাঠে আছেন আওয়ামীপন্থী শিল্পপতি সালাউদ্দিন। এছাড়া তার মাথার ওপর ছায়া হিসেবে আছেন এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী। এখন তার সমর্থন সালাউদ্দিন আলমগীরের পক্ষে।
এদিকে সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে একটি মামলাও হয়েছে গণঅভ্যুত্থানের পর যেখানে আওয়ামীলীগের সাবেক সংসদ সদস্য খান আহমেদ শুভসহ টাঙ্গাইলের স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতাদেরও আসামি করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের দাবিতে গত ২২ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছিলেন স্থানীয় ছাত্র জনতা।
সালাউদ্দিনকে শেখ ফজলে নূর তাপস এবং গাজীপুরের সাবেক সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলন দমনে অর্থের যোগানদাতা হিসেবে তাকে অভিযুক্ত করে মানববন্ধনে বলা হয়, “ফ্যাসিবাদের এই দোসর খুনি হাসিনার সঙ্গে বিভিন্ন দেশে সফর করেছেন এবং এখনও দেশের বাইরে গিয়ে শেখ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। দেশকে অস্থিতিশীল করতে অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে অর্থ সরবরাহ করছেন।”
মানববন্ধনে সাহরিয়ার আলম বলেন, শেখ ফজলে নূর তাপস এবং গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলন দমনে অর্থ দিয়েছেন সালাউদ্দিন। তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বহাল তবিয়তে রয়েছেন। তাকে গ্রেফতার করা হয়নি।
মানববন্ধনে প্লেকার্ডে সালাউদ্দিন আলমগীরের সঙ্গে তাপসের ছবি ছাড়াও শেখ হাসিনা ও তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে জুম মিটিংয়ের ছবি প্রদর্শন করা হয়। এসময় আওয়ামীলীগের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে তার একাধিক ছবি প্রদর্শন করে প্রতিবাদ জানানো হয়।