ইরান যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অর্থনীতিতে একধরনের প্রাণ সঞ্চার হয়েছে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেমলিনের আয় বাড়ছে। এতে দেশটির ফেডারেল বাজেট ঘাটতি কমছে; ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ চালানোর মতো অর্থের সংস্থান হচ্ছে।
শুধু তেল নয়, ইরান সংঘাতের কারণে প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারের বৈশ্বিক সরবরাহে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাতেও রাশিয়া আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) জ্যেষ্ঠ সহযোগী বেন কাহিল বলেন, ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হচ্ছে রাশিয়া। তাঁর ভাষায়, এত দিন রাশিয়া ছাড় দিয়ে তেল বিক্রি করত, কিন্তু যুদ্ধের বদৌলতে তারা এখন বাজারমূল্যে তেল বিক্রি করছে। রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য এটা বড় ধরনের ইতিবাচক ঘটনা।
বাস্তবতা হলো, যুদ্ধের আগে রাশিয়া প্রকৃত অর্থেই বাজেট সংকটে পড়তে যাচ্ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের বদৌলতে সেই সংকট পুরোপুরি না কাটলেও তারা কিছুটা সময় পেয়েছে।
এই স্বস্তি কত দিন থাকবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে ইরান যুদ্ধের স্থায়িত্বের ওপর। তবে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ইতিমধ্যে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে রাশিয়া। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় ইঙ্গিত দিয়েছে, চলতি বছর যে ব্যয়সংকোচনের পরিকল্পনা ছিল, তা এখন ২০২৭ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে।
কার্নেগি সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো সের্গেই ভাকুলেঙ্কোর হিসাবে, মার্চের মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়ার উরাল তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারে পৌঁছেছে, ফেব্রুয়ারির তুলনায় দ্বিগুণ। মার্চের শুরুতে ব্যারেলপ্রতি ৩০ ডলার বেড়েছে এই তেলের দাম। সেই হিসাবেও এ মাসে অতিরিক্ত ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৮৫০ কোটি ডলার আয় হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার সরাসরি রাষ্ট্রের কোষাগারে যাচ্ছে, বাকি অংশ তেল কোম্পানিগুলোর খাতায়।
ব্রাসেলসভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ব্রুয়েগেলের জ্যেষ্ঠ ফেলো সিমোনে তাগলিয়াপিয়েত্রা বলেন, রাশিয়ার বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অর্থ আসে তেল ও গ্যাস বিক্রির আয় থেকে। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ চালাতে এই অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, এতে ইউক্রেনের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা শিথিল, বদলে যাচ্ছে বাজার
ইরান যুদ্ধের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার তেলের ক্রেতা কমে যাচ্ছিল। ভারতসহ বড় ক্রেতারাও কম দামে তেল কিনতে চাপ দিচ্ছিল।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার( আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার তেল ও তেলজাত পণ্যের রপ্তানি দৈনিক ৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন বা ৬৬ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে—২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সর্বনিম্ন। একই সময়ে রপ্তানি আয় কমে যায় প্রায় ৩০ শতাংশ।
তবে ইরান যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে সমুদ্রপথে রুশ তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে।
উপাত্ত বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য বলছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বাড়িয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তারা রাশিয়ার কাছ থেকে যে তেল কিনেছে, মার্চ মাসে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। এমনকি সম্প্রতি ভারত ব্রেন্ট ক্রুডের চেয়েও বেশি দামে উরাল কিনেছে।
এদিকে ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই ক্ষতির প্রভাব অনেকটাই সামাল দিতে পারছে তারা। রয়টার্সের হিসাবে, ড্রোন হামলা, পাইপলাইন সংকট ও ট্যাংকার জব্দের কারণে রাশিয়ার তেল রপ্তানির অন্তত ৪০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যাহত হয়েছে।
গ্যাস ও সারে নতুন সুযোগ
হরমুজ প্রণালি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ায় শুধু তেল নয়, প্রাকৃতিক গ্যাস, সার, হিলিয়াম ও অ্যালুমিনিয়ামের সরবরাহও ঝুঁকির মুখে। বাস্তবতা হলো, রাশিয়ায় শুধু তেল উৎপাদন হয় না, এসব পণ্যও বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করা হয়।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সার রপ্তানিকারক হিসেবে রাশিয়া ইতিমধ্যে বেশি কার্যাদেশ পাচ্ছে। নাইজেরিয়া ও ঘানার আমদানিকারকেরা আগাম চালান নিশ্চিত করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরশীলতায় পরিণত হতে পারে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও রাশিয়া বড় শক্তি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার গ্যাস থেকে পুরোপুরি সরে আসার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে পারে—এমন ধারণাও জোরালো হচ্ছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এ ক্ষেত্রেও রাশিয়া কৌশলগতভাবে জিতে যাচ্ছে।
ভারত-চীনের কৌশল বদলের ইঙ্গিত
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ও চীন যদি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমায়, তাহলে তারা রাশিয়ার দিকে আরও ঝুঁকে পড়তে পারে। তখন বড় আকারের পাইপলাইন ও জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্পের যৌক্তিকতা তৈরি হবে। অর্থাৎ জ্বালানি সরবরাহে রাশিয়া, ভারত ও চীনের মধ্যে বড় ধরনের অবকাঠামো গড়ে উঠতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাশিয়ার প্রস্তাবিত ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’শীর্ষক প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পে আগে চীন তেমন আগ্রহ দেখায়নি। তবে এখন বেইজিং আগ্রহী হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিষয়টি হলো, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া বা নৌ অবরোধের ঝুঁকি এড়িয়ে নিরাপদে স্থলপথে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা—এই বিষয়টি এখন বিকল্প হিসেবে আগের তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে।
ইউরোপের ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে রাশিয়ার বাজারে তেল সরবরাহ করতে রাশিয়া পূর্ব সাইবেরিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর পাইপলাইন নির্মাণ করেছে। এই পাইপলাইনে প্রতিদিন প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হয়। এর একটি শাখা সরাসরি চীন পর্যন্ত গেছে। বিদ্যমান বাস্তবতায় বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই পাইপলাইনের সক্ষমতা বৃদ্ধির যৌক্তিকতা তৈরি হয়েছে।
তবে রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর এশিয়ার আগ্রহ দীর্ঘস্থায়ী না–ও হতে পারে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক তাতিয়ানা মিত্রোভার মতে, ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও এমনকি কয়লার ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহিত হবে চীন ও ভারত। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এই দুই অর্থনীতি জ্বালানি আমদানি–নির্ভরতা কমাতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি মনে করেন।
ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক পরিবহন ব্যয় ও পণ্যমূল্য বাড়ছে। রাশিয়ার ওপরও তার প্রভাব পড়ছে। উন্নত অর্থনীতিগুলোর জোট অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো–অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) চলতি বছরে রাশিয়ার মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে। তারা মনে করছে, এ বছর রাশিয়ার মূল্যস্ফীতি হবে ৬ শতাংশ।
ওইসিডির পূর্বাভাস, ২০২৬ সালে রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ; ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্প মেয়াদে তেল ও গ্যাস থেকে বাড়তি আয় কিছুটা স্বস্তি দিলেও তা রাশিয়ার অর্থনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে সরকারি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। এর স্বাভাবিক পরিণতি হলো, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়া। ফলে ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
| ফজর | ৪:৪৮ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১১:৫৬ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৩:৪৩ টা বিকাল |
| মাগরিব | ৫:১৮ টা সন্ধ্যা |
| এশা | ৭:০০ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১২:০০ মিনিট দুপুর |

