মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের তিন দিনের সফরের ঘোর কাটতে না কাটতেই বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে আরেক ঘোর। এলেন আরেক রাজমেহমান যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক ফ্লিট বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের কমান্ডার অ্যাডমিরাল স্টিফেন কোহলার। তার সফরও তিন দিনের। ঢাকা-ওয়াশিংটন কূটনৈতিক তৎপরতার ধারাবাহিকতায় তার এ সফর। সঙ্গে ২২ সদস্যের নৌ প্রতিনিধিদল। তা দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় নতুন দিগন্তের বার্তা। একে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্ব এবং ওয়াশিংটন ও ঢাকার দ্বিপক্ষীয় সামরিক সম্পর্ক শক্তিশালীকরণের ইঙ্গিত। সে কারণেই অ্যাডমিরাল কোহলারের নেতৃত্বে আসা প্রতিনিধি দলটির সিরিজ বৈঠক বাংলাদেশের সামরিক ও প্রশাসনিক নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে।
নৌবাহিনীতে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে স্টিফেন কোহলার ইউএসএস কার্ল ভিনসনের এক্সিকিউটিভ অফিসার এবং ফাইটার স্কোয়াড্রন ১৪৩, ইউএসএস বাতান ও বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ারের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কর্মজীবনে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম, সাউদার্ন ওয়াচ, ইরাকি ফ্রিডম ও ইনহেরেন্ট রিজলভ-সহ একাধিক ঐতিহাসিক সামরিক অভিযানে অংশ নেন। এ ছাড়া বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ও লিবিয়া সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক যৌথ অভিযানেও ছিল তার বিশেষ ভূমিকা। ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন প্যাসিফিক ফ্লিটের কমান্ডারের দায়িত্ব নেন। তিনি ঢাকা আসার আগে সার্জিও গোর ঢাকা সফরে কিছু বার্তা দিয়ে যান। যা কেবল দু’দেশের দ্বিপক্ষীয় নয়। সঙ্গে আশপাশের আরও অনেক কিছু।
সফরকালে সার্জিও গোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছেন, ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন এবং সফরের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন। এর পরও সারজিও গোরের সফরের পর কারও কপালে কেন চিন্তার ভাঁজ? কেন কারও তৃপ্তির হাসি? এর ব্যাখ্যাও নানা রকম। গোর কোনো মামুলি কূটনীতিক নন। ট্রাম্প প্রশাসনের অত্যন্ত ক্ষমতাধর তিনি। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং ব্যবসায়িক পার্টনার। মিথ আছে, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘চোখ ও কান’ তিনি। গোরের এটি প্রথম বাংলাদেশ সফর। তিনি ঢাকায় পা রাখার আগেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। চীনা দূতাবাস বলছে, ‘উভয় পক্ষ চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং পারস্পরিক উদ্বেগের অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিশদ আলোচনা করে।’ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সার্জিও গোর বলেন, খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিনিয়োগকারী বাংলাদেশ সফরে আসবেন। তারা সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাত পর্যালোচনা করবেন এবং কোথায় বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, তা যাচাই করবেন।
তার এই বক্তব্যের কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৫টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বকারী প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফরে আসবেন। তারা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন। তার সফরের ব্যতিক্রম দিক ছিল ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠক। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকেই ওই বৈঠকের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বৈঠকটি যারপরনাই তাৎপর্যময়। তা বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক কৌশলগত সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয়তার আরেক ইঙ্গিত। ঢাকা সফরের মাঝপথে পূর্বঘোষণা ছাড়া দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠক, এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দীনেশের দিল্লি যাত্রা ঘটনাটিকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, এমন কোনো বৈঠক সম্পর্কে তার কাছে তথ্য নেই। বাংলাদেশ সরকারও এ বিষয়ে নীরব। দুই দেশের নীরবতাই কৌতূহল আরও বাড়িয়েছে। ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে অনির্ধারিত বৈঠক আর এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দিল্লিতে দীনেশের আকস্মিক যাত্রা। কেন তার এভাবে তড়িঘড়ি দিল্লি ছুটে যাওয়া। আবার দ্রুত ফিরে আসা? জবাব এখনো মেলেনি। এ নিয়ে চলছে কেবল বিশ্লেষণ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর কোনো যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা আরেক প্রশ্ন।
পূর্বনির্ধারিত নৈশভোজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়। কেন এ পরিবর্তন, সে বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকও রহস্যাবৃত। বিরোধীদলীয় কারও সঙ্গে বৈঠক না করাও প্রশ্নবিদ্ধ। সফরের দ্বিতীয় দিন গত ৩১ জুলাই রাজধানীতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও সাবেক পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে তার বৈঠকটি হয়েছে অনেকটা ‘গোপনীয়তায়’। সার্জিও গোর তার ঢাকা সফরের বিভিন্ন বৈঠকের তথ্য নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেছেন। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসও ফেসবুক পেজ ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তার কর্মসূচির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছে। কিন্তু কোথাও সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো বৈঠকের উল্লেখ নেই। ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সার্জিও গোরের বৈঠকের কথাও গোরের এক্স অ্যাকাউন্ট বা মার্কিন দূতাবাসের আনুষ্ঠানিক প্রচারে উল্লেখ করা হয়নি। গোরের সফরের আগে দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে এনসিপি নেতাদের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বৈঠক, প্রশ্ন আগে থেকেই। আর এ সময়েই মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত নতুন বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যোগদান।
লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই জোটের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছে সৌদি আরব। তাও সৃষ্টি করেছে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত কিছু জটিল প্রশ্ন। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি এবং ভারত ও চীনের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা জমেছে। তা বাংলাদেশের সামনে সমস্যা না সম্ভাবনার এ প্রশ্ন নিষ্পত্তিহীন। প্রকারান্তরে উভয় সংকট। জোটে যোগ দিলে ইরান ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরোধিতার ঝুঁকি। আবার জোট থেকে দূরে থাকলে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কে নির্ঘাত টানাপোড়েন। এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কেও পড়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সৌদি গণমাধ্যম আরব নিউজের তথ্য অনুযায়ী, ৫১টি দেশকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবসহ ১৪টি দেশ এই জোটে যুক্ত হয়েছে। সদস্যদেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, তুরস্ক, পাকিস্তান, মিসর, জর্ডান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও নাইজেরিয়া। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বৈঠকে অংশ নেন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান। সৌদি আরবের দাবি, এ জোট সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক। কোনো রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে এটি গঠন করা হয়নি। মূল কাজ হবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ মহড়া, সমন্বিত টহল এবং আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা। এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন লোহিত সাগরে নিরাপত্তা সংকট, ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
এর সঙ্গে বড় ধরনের কূটনৈতিক ঝুঁকিও জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতির কথা বলে এসেছে। সেই অবস্থান থেকে কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হওয়া অস্বাভাবিক। বাংলাদেশ অতীতে কোনো প্রতিরক্ষা জোটের সক্রিয় সদস্য ছিল না। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা ইরান। সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হলেও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতা এখনো শেষ হয়নি। এই অবস্থায় সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ তেহরান কীভাবে নেবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নতুন এই জোটকে ঘিরে ভারতের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত সরাসরি এই জোটের সদস্য না হলেও ভারত মহাসাগর ও আরব সাগর অঞ্চলের নিরাপত্তাকে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। ফলে বাংলাদেশের নতুন অবস্থান নয়াদিল্লির জন্য ভাবনার বিষয়।
বাংলাদেশ এর আগে ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত সন্ত্রাসবাদবিরোধী ইসলামি সামরিক জোটে যোগ দিলেও অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। রিয়াদে পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধি দলও পাঠানো হয়নি। এবার নতুন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ায় বাংলাদেশের ভূমিকা কী হবে, তা অপেক্ষা করে দেখার বিষয়। অপেক্ষার বিষয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়া, না দেওয়ার বিষয়ও। বিষয়টি নিয়ে সরকার, কূটনৈতিক মহল এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চললেও এখনো সুরাহা হয়নি। তবে সেপ্টেম্বরেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রস্তুতি বেশ এগোচ্ছে। চলছে ব্যাপক হোমওয়ার্ক।