আমাদের স্কুল অব লিডারশিপ কাজ করছে নৈতিক নেতৃত্ব ও পরসমালোচনার পরিবর্তে আত্মসমালোচনা নিয়ে। এ প্রসঙ্গে আসছি একটু পরে।
কিছুদিন আগে আমার বাসায় আড্ডা দিচ্ছিলাম। রাষ্ট্রদূত ও সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারি সেখানে ছিলেন। এই মানুষটি খুব সুন্দর করে গুছিয়ে বাংলা ও ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন। তাই তাকে আমি পছন্দ করি।
ওনার মতো বিদ্বান লোক আমাদের সমাজে বড় প্রয়োজন। আমি বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরে নেতা তৈরি করতে চাই ও নিজেকেও তৈরি করার চেষ্টা করছি এমন গুণের অধিকারী হিসেবে।
এই সমাজের সবচেয়ে বড় অসুখ একে অন্যের সমালোচনা করা, পিছনের সারিতে বসে সামনের সারিতে বসে থাকা মানুষকে মন্দ বলা বা ভাবা। আর অন্যদিকে নৈতিক নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হলো নিজেকে সংশোধন করার সক্ষমতা। একজন নেতা যখন অন্যের ভুল, ব্যর্থতা বা দুর্বলতা নিয়ে ক্রমাগত সমালোচনা করেন, তখন তিনি সাময়িকভাবে নিজেকে হয়তোবা শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে পারেন; কিন্তু এতে নেতৃত্বের নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং প্রকৃত নৈতিক নেতৃত্ব ব্যাহত হয় ।
এই প্রশ্ন খুব জরুরি - “সমস্যার জন্য আমার নিজের ভূমিকা কী?”
পরসমালোচনা মানুষকে বিভক্ত করে, আর আত্মসমালোচনা মানুষকে উন্নত করে। অন্যের ভুল খুঁজে বের করা তুলনামূলকভাবে সহজ; কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত, আচরণ, স্বার্থ, সীমাবদ্ধতা ও ভুলকে নিরপেক্ষভাবে বিচার করা কঠিন।
তাই আত্মসমালোচনা আসলে দুর্বলতার প্রকাশ নয়—এটি নৈতিক সাহসের প্রকাশ। বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে - আমরা কেউই সমালোচনা নিতে পারি না ।
একজন নৈতিক নেতা মনে করেন, “আমি সবসময় সঠিক”—এমন ধারণা নেতৃত্বকে কর্তৃত্ববাদী করে তোলে। বিপরীতে, “আমিও ভুল করতে পারি”—এই স্বীকারোক্তি নেতাকে জবাবদিহিমূলক ও মানবিক করে। কারণ যে নেতা নিজের ভুল স্বীকার করতে পারেন, তিনিই অন্যের ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত অবস্থান নিতে পারেন।
এখানে আত্মসমালোচনা মানে নিজেকে অপমান করা নয়। আত্মসমালোচনা হলো নিজের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডকে নৈতিক মানদণ্ডে পরীক্ষা করা। কোথায় ভুল হয়েছে, কেন হয়েছে, তার ফলে কার ক্ষতি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে একই ভুল এড়ানো যায়—এই চারটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই আত্মসমালোচনার প্রকৃত উদ্দেশ্য।
বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের মানুষ চরমভাবে এই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে- তা পরিবর্তনে চেষ্টা করেছি অনেক - কিছু কাজ হয় না। হয়তো আমাকেই বিশ্বাস করে না। পরবর্তীতে ভাবলাম স্কুল অব লিডারশিপ নিয়ে এই বিষয়টি এগিয়ে রাখি।
সুতরাং, নৈতিক নেতৃত্বের একটি মৌলিক নীতি হতে পারে:
“অন্যের ভুল প্রকাশ করার আগে নিজের ভুলের মুখোমুখি হও; কারণ যে নেতৃত্ব আত্মসমালোচনা করতে জানে, সেই নেতৃত্বই ন্যায়সংগতভাবে অন্যের সমালোচনা করার নৈতিক অধিকার অর্জন করে।”
এভাবে আড্ডা দেশে বিদেশে চলবে - স্কুল অব লিডারশিপ নেতৃত্ব গঠনে সব চত্বরে পোক্তভাবেই বিচরণ করবে।
লেখক : বাঙালির পাঠশালা ও স্কুল অব লিডারশিপের প্রতিষ্ঠাতা।