ইসলাম আগমনের পূর্বে আরবদেশে পোশাক শিল্প, চর্মকার ও রাখালের পেশা ইত্যাদি যৎসামান্য কিছু কর্ম ছাড়া তেমন কোনো শিল্পের প্রসার ছিল না। ব্যবসাই ছিল আরবদের আয়-উপার্জনের সর্বপ্রধান অবলম্বন।
কিন্তু তাদের চিরায়ত আত্মকলহ ও ডাকাত দলের হানা তাদের ব্যবসার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াত। তাই তাদের ব্যবসা শুধু পবিত্র মাসগুলোতেই জমে উঠত। চড়া সুদ নিছক ব্যবসা হিসেবে তাদের জীবন প্রবাহের একটি অংশে পরিণত হয়েছিল।
রাসুলুল্লাহ্ (সা.) শিশুকাল কাটিয়েছিলেন পবিত্র নগরী মক্কায়। কোরাইশদের শীতকালে ইয়েমেন ও গ্রীষ্মে সিরিয়া ভ্রমণ ছিল দুটি অপরিহার্য বাণিজ্যিক ভ্রমণ। সর্দার হাশিম ইবনে আবদে মানাফ কোরাইশের ধনী-দরিদ্র সকলের মাঝে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বন্ধন সৃষ্টি করার আহ্বান জানান। ঠিক এই সময় এসে পড়ে ইসলামের বাণী। এছাড়াও কোরাইশের আকাশে ছিল তখন ধনাঢ্যতা ও শৌর্য-বীর্যের ফকফকা রোদ। এমন খাঁটি বাণিজ্যিক পরিবেশেই বেড়ে উঠেন মহানবী (সা.)।
বার বছর বয়সে রাসুলুল্লাহ (সা.) চাচা আবু তালিবের সাথে সিরিয়ার পথে একটি বাণিজ্যিক কাফেলায় অংশগ্রহণ করেন। পথিমধ্যে ‘বুহাইরা’ নামক এক খৃস্টান পাদ্রীর সাথে দেখা হলে তিনি শিশু মুহাম্মদকে ইহুদিদের থেকে সাবধানে রাখার পরামর্শ দেন। তাই আবু তালিব দ্রুত তাকে নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন।
যৌবনে উপনীত হবার পর মেষ চরানো এবং পরে ব্যবসার মাধ্যমে শুরু হয় মহানবীর (সা.) অর্থনৈতিক জীবন। তাঁর ব্যবসায়িক সুনাম ও ‘আল-আমিন’ উপাধিতে ভূষিত হওয়ার কারণে খাদিজা (রাজিআল্লাহু তায়ালা আনহা) তাকে প্রথমত ব্যবসা ও দ্বিতীয়ত স্বামী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। সততা ছাড়াও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মধ্যে বুদ্ধিমত্তা, দৈহিক শক্তি ও বিচক্ষণতা ইত্যাদি গুণের সমাবেশ ঘটেছিল।
পবিত্র কোরআনের ভাষায়: ‘নিশ্চয় সর্বোত্তম শ্রমিক তো সেই যে বলিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত’।
হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন ধনবতী, ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী মহিলা। তিনি তার পুঁজি দিয়ে লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্বভিত্তিক যৌথ ব্যাবসা করতেন। খাদিজা (রা.) মহানবীর (সা.) সততা ও উত্তম চরিত্রের কথা জানতে পেরে তাঁকে পুঁজি নিয়ে সিরিয়ায় ব্যবসায়িক সফরে যাওয়ার জন্য আবেদন জানালেন। মহানবী (সা.) তার প্রস্তাব গ্রহণ করলেন এবং দ্বিগুণ পুঁজি ও বিনিময় নিয়ে খাদিজার ক্রীতদাস ‘মায়সারাহ’র সঙ্গে সিরিয়ার পথে বাণিজ্যিক সফরে বের হলেন। বিগত সফরসমূহের তুলনায় এবার সফরে দ্বিগুণ লাভ হলো। ‘মায়সারাহ’ খাদিজার নিকট রাসুল (সা.)-এর বিশ্বস্ততা ও মহান চরিত্রের বর্ণনা দিল। খাদিজা (রা.) বিশেষত রাসুল (সা.)-এর সংস্পর্শে আসার পর তার সম্পদে যে সমৃদ্ধির চিহ্ন ফুটে উঠেছে তা দেখে বিস্মিত হলেন। তিনি তার বান্ধবী ‘নাফিসাহ’র মাধ্যমে রাসুল (সা.)-এর নিকট বিবাহের প্রস্তাব পেশ করেন। রাসুল (সা) এ ব্যাপারে তাঁর চাচাদের সঙ্গে মতবিনিময় করলে তারা বিবাহ সম্পন্ন করেন।
স্বামী হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.) খাদিজার ব্যবসার তত্ত্বাবধান করতেন। সাথে সাথে নিজেও খাদিজার পুঁজি নিয়ে পুরোদমে ব্যবসা করছিলেন। তিনি ছিলেন বাণিজ্য নগরী মক্কার সর্বাধিক পুঁজিবান ব্যবসায়ী। নিঃসন্দেহে এই দীর্ঘ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাই তাঁর জন্য মদিনায় অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটাতে সহায়ক প্রমাণিত হয়েছিল।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনাড়ম্বর জীবনচরিত দেখে একথা ভুলে গেলে চলবে না, তিনি ছিলেন মক্কার সবচেয়ে বলিষ্ঠ, বুদ্ধিমান ও অধিক পুঁজিবান ব্যবসায়ী। নবি হওয়ার পূর্বে তিনি মানবসেবায় নিজের পুঁজি কী পরিমাণ খরচ করতেন তা খাদিজার (রা.) ভাষায় ফুটে উঠছে : ‘নিশ্চয় আপনি আত্মীয়তার বন্ধন রচনা করেন, মেহমানদারি করেন ও অনাথকে বহন করেন এবং নিঃস্বের জন্য উপার্জন করেন..। ’
মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি কনিষ্ঠ চাচা হযরত জুবায়ের (রাজিআল্লাহু তায়ালা আনহু) এবং কয়েকজন যুবককে নিয়ে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে একটি সমাজসেবামূলক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
মূর্খতার যুগ পেরিয়ে আসা এক পথবিচ্যূত সমাজের মাঝে নবুওয়তের এমন নতুন দাওয়াত নিয়ে দাঁড়ানোর জন্য বহু অর্থেরও প্রয়োজন ছিল। নবুওয়তের গুরুদায়িত্ব বহনের পর রাসুলুল্লাহ্ (সা.) ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোনিবেশ করতে পারছিলেন না। তথাপি তাঁর নিজস্ব ও খাদিজা (রা.) হতে প্রাপ্ত পুঁজি দ্বারা নতুন ধর্মের প্রচার করতে লাগলেন। নও-মুসলিম সাহাবিগণের মাঝে যারা সামর্থ্যহীন তাদের খরচাদি রাসুল (সা.) নিজেই বহন করেছিলেন।
সহজে রাসুল (সা.)কে বধ করতে না পেরে কোরাইশ বনু হাশিম ও বনু আবদুুল মুত্তালিবকে হুমকি দিল যে, তাদের হাতে মুহাম্মদকে (সা.) সমর্পণ না করলে তাদেরকে বয়কট করা হবে। কোরাইশ তিন বছর (মতান্তরে দুই বছর) এ নির্বাসনে অটল থাকল। রাসুল (সা.) ও মুসলমানগণ মর্মান্তিক কষ্টের সম্মুখীন হলেন।
ঝর্ণাধারা ও কূপসমূহের আধিক্যের কল্যাণে মদিনার অর্থনৈতিক জীবন ছিল কৃষিনির্ভর। এছাড়াও গহনাদি ও অস্ত্রশস্ত্র তৈরি, খনিজ ও বয়ন শিল্প বহুল সমাদৃত ছিল। ব্যাপক হারে সুদের আদান-প্রদান চলতো। কিন্তু গোত্র-বিভেদ ও সংঘাতের কারণে মদিনার অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল চরম অবনতির শিকার।