1. [email protected] : admi2019 :
info@deshertvusa.tv +8801979-343434
প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি আন্তজাতিক খেলা বিনোদন প্রবাস আরও
| বঙ্গাব্দ

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর: অপরাধের ‘রুট কজ’ বনাম একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার আখ্যান!

প্রতিবেদনঃ অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইমঃ 04-06-2026 ইং
  • 957 বার পঠিত
ad728

যেকোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে অপরাধবিজ্ঞানের (Criminology) মৌলিক সূত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি নির্মম সত্য বারবার সামনে আসে—অপরাধের মূল চালিকাশক্তি বা ‘রুট কজ’ (Root Cause) হলো মাদক। চুরি, ছিনতাই, খুন, কিশোর গ্যাং কালচার থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অপরাধের সিন্ডিকেট গড়ে ওঠেছে, তার সিংহভাগেরই জ্বালানি জোগান দেয় অবৈধ মাদকদ্রব্য। অতি সম্প্রতি আমাদের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) শীর্ষ নেতৃত্বের যৌক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যায় বিষয়টি আবারও জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়েছে।


রাষ্ট্র এই মরণব্যাধি দমনের জন্য সম্পূর্ণ সুনির্দিষ্ট এবং বিশেষায়িত একটি সংস্থা গড়ে তুলেছে, যার নাম ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর’ (DNC)। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, যেখানে মূল ব্যাধি নির্মূলে এই সংস্থার সর্বাধিক তৎপর থাকার কথা ছিল, সেখানে এর বর্তমান অবস্থান ও ভূমিকা কী? দুর্ভাগ্যবশত, ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের আপামর ছাত্র-জনতা স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে যে কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করেছিল, তার কোনো ন্যূনতম আঁচ বা প্রতিফলন এই অধিদপ্তরে লাগেনি। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব এবং বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা মোঃ হাসান মারুফকে এই অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিগত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর এই চেয়ারে আসীন থাকার পুরো মেয়াদকাল পর্যালোচনা করলে সুশাসন এবং সংস্কারের কোনো বাস্তব উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং জনমনে তীব্র গুঞ্জন রয়েছে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রভাবশালী কোনো মহলের নেপথ্য ইশারায় বিশেষ তরিকায় তিনি এই পদটি বাগিয়ে নিয়েছিলেন এবং একই পুরোনো তরিকায় তিনি আজও বহাল তবিয়তে আছেন।


ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা ও এনফোর্সমেন্ট 

ক্রাইসিসঃ মাঠপর্যায়ে ডিলিং বা সাপ্লাই চেইন বন্ধের ক্ষেত্রে ডিএনসি সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে শুরু করে রাজধানীর অলিগলিতে মাদকের অবাধ বিস্তার প্রমাণ করে যে, অধিদপ্তরের গোয়েন্দা জাল এবং এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম কতটা দুর্বল ও অকার্যকর। বর্তমান মহাপরিচালকের মেয়াদে দৃশ্যমান কোনো বড় আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক মাদক চোরাচালান সিন্ডিকেট ভাঙার রেকর্ড নেই; বরং চুনোপুঁটি বা খুচরা বিক্রেতা আটকে লোকদেখানো অভিযানের মাধ্যমেই দায়িত্ব শেষ করা হচ্ছে।

দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান চললেও বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, বর্তমান মহাপরিচালকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ছত্রছায়ায় বিভিন্ন অভিজাত সিসা লাউঞ্জ এবং অবৈধ বারগুলো তাদের কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে। এর বিনিময়ে একটি সুনির্দিষ্ট সিন্ডিকেট নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা বা কমিশন আদায় করে থাকে বলে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুরুতর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।


পুরাতন ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা (Status Quo) ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যঃদেশে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসার পরও ডিএনসি-র শীর্ষ নেতৃত্বে কোনো পরিবর্তনমুখী সংস্কার বা শুদ্ধি অভিযান দৃশ্যমান হয়নি। পুরোনো ‘ম্যানেজ’ করার এবং ‘ম্যানেজ হয়ে’ চলার যে দুর্নীতিগ্রস্ত ঐতিহ্য, বর্তমান ডিজি সেই পুরোনো ধ্বংসাত্মক সিস্টেমে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।


গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অধিদপ্তরে যোগদানের পর মোঃ হাসান মারুফ কার্যালয়ে একটি নিজস্ব শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং বড় বড় দরপত্র বা টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ উঠেছে। লাইসেন্স নবায়ন, মদের বার বা ক্লাবের ছাড়পত্র প্রদান এবং ওভারসিজ

ইনস্পেকশনের নামে যে কোটি কোটি টাকার অনৈতিক বাণিজ্যের সিন্ডিকেট আগে সক্রিয় ছিল, তা বর্তমান মেয়াদেও সমানভাবে বহাল রয়েছে।এমনকি এই সিন্ডিকেট বাণিজ্য এবং দুর্নীতি থেকে অর্জিত লাখ লাখ টাকা অবৈধ উপায়ে বিদেশে (যেমন: নিউইয়র্কে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনা) পাচার করা হয়েছে বলে কিছু অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যা স্বাধীন তদন্তের দাবি রাখে।

প্রশাসনিক স্থবিরতা ও ‘ব্যর্থতার’ অকাট্য 


খতিয়ানঃএকটি বিশেষায়িত সংস্থার প্রধানের মূল কাজ যেখানে পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মপরিকল্পনা সাজানো, সেখানে বর্তমান মহাপরিচালকের প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা অধিদপ্তরের চেইন অব কমান্ডকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করা আবশ্যকঃ আইন ও বিধিমালার 


আধুনিকায়নে অনীহা:মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিধিমালাগুলোকে যুগোপযোগী করার কোনো রূপরেখা বা খসড়া তাঁর এই দীর্ঘ মেয়াদে আলোর মুখ দেখেনি।লজিস্টিক ও জনবল ঘাটতি পূরণে 


ব্যর্থতা:অধিদপ্তরের জনবল সংকট ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাব দীর্ঘদিনের। বর্তমান ডিজি এই সংকট কাটাতে কোনো যুগান্তকারী পলিসি বা সরকারের উচ্চপর্যায়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে পুলিশ বা র‍্যাবের মতো অন্যান্য বাহিনী যখন আধুনিক ট্র্যাকিং ও ফরেনসিক প্রযুক্তি (টুলস) ব্যবহার করছে, ডিএনসি তখনো সনাতন পদ্ধতিতে ধুঁকছে।


যুগান্তকারী কোন অভিযানের অনুপস্থিতি:

তাঁর মেয়াদে মাদকের রুট বা রুটিনম্যাপ অনুযায়ী কোনো 'মেগা ক্র্যাকডাউন' বা সমন্বিত সীমান্ত টহল চালুর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি, যা তাঁর চরম নেতৃত্বহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার চূড়ান্ত প্রমাণ।ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির পুনর্বাসন ও রাজনৈতিক 


সুবিধাভোগঃ মোঃ হাসান মারুফ বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন এবং স্বৈরাচারী শাসনযন্ত্রের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী- আবার ইউনূস সরকারের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সন্তুষ্ট করে এবং একজন জুলাই যোদ্ধার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদ লাভ করেন।নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজের অবস্থান ধরে রাখতে আবার ভোল পাল্টানোর চেষ্টা করছেন বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়। একটি রাষ্ট্র যখন ফ্যাসিবাদের অবশিষ্টাংশ দূরীকরণে সচেষ্ট, তখন এই ধরনের সংবেদনশীল সংস্থায় পুরোনো আমলের তোষামোদি সংস্কৃতির কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন পুরো ব্যবস্থার আমূল সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করছে।


সবচেয়ে আশঙ্কাজনক অভিযোগ হলো, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মাদক আইনের অপব্যবহার। দেশব্যাপী চলমান বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের তালিকাভুক্ত করে এবং অ-জামিনযোগ্য মাদক ধারায় মামলা দিয়ে হেনস্তা করার পেছনে তাঁর নির্দেশনা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মূলত উচ্চতর পদে (সচিব) পদোন্নতি বা তদবিরের ক্ষেত্রে নিজের বিশেষ আনুগত্য ও দক্ষতা প্রদর্শনের জন্য তিনি এই অপকৌশল বেছে নিয়েছেন বলে গণমাধ্যমগুলো উল্লেখ করেছে।আখের গোছানোর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ও 


জবাবদিহিতার অভাবঃ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চেয়ারে বসে ডিজি সাহেব সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বা মাদক নির্মূলের চেয়ে কাদের স্বার্থরক্ষা এবং আখের গোছানোর মিশনে ব্যস্ত, তা আজ সর্বসাধারণের মনে এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কোনো দূরদর্শী পরিকল্পনা বা কর্মপন্থা তাঁর চিন্তা কিংবা কর্মে বিন্দুমাত্র প্রতিফলিত হয়নি। অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে এক ধরনের অস্বচ্ছ ও আর্থিক লেনদেনের সংস্কৃতির অভিযোগ উঠেছে, যা তাঁর তদারকি ও সততার অভাবকে সরাসরি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ ও উত্তরণের।


পথঃ অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায়, একটি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হলো তার যুবসমাজকে মাদকের নেশায় বুঁদ করে রাখা। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই কাজটি করেছিল এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে একটি 'ঠুঁটো জগন্নাথ' সংস্থায় পরিণত করে রেখেছিল। দুঃখজনকভাবে, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও যখন এই সংস্থায় কোনো পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে না, এবং নেতৃত্বের চরম ব্যর্থতা ও দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সত্ত্বেও একই ব্যক্তি পদে বহাল থাকেন, তখন বুঝতে হবে ঘুণে ধরা পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামোটি এখনও ভাঙা সম্ভব হয়নি।উপরিউক্ত তথ্য-প্রমাণ ও পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ভিত্তিতে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, বর্তমান মহাপরিচালক মোঃ হাসান মারুফের মেয়াদে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তিনি এই সংস্থাকে গতিশীল করতে তো পারেনইনি, বরং নিজের পূর্বতন আমলাতান্ত্রিক খোলসের ভেতরে এটিকে বন্দি করে রেখেছেন।দেশের সার্বিক সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং অপরাধের ‘রুট কজ’ বা মূল শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে আমূল ঢেলে সাজাতে হবে। বিশেষ তরিকায় নিয়োগপ্রাপ্ত, অযোগ্য এবং পুরোনো সিস্টেমের সুবিধাভোগী বর্তমান নেতৃত্বকে অবিলম্বে অপসারণ করে সেখানে সৎ, সাহসী, গতিশীল এবং দেশপ্রেমিক পেশাদারদের দায়িত্ব দেওয়া এখন সময়ের তীব্র দাবি। অন্যথায়, ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন মাদকের নীল দংশনে আবারও অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাবে।


- প্রফেসর ড. শেখ আসিফ মিজান

লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং সুশাসন ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ।

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

  • Facebook
  • Whatsapp
  • Linkedin
  • প্রিন্ট নিউজ
  • কপি লিঙ্ক
এ জাতীয় আরো খবর..

ad728
ad728
ad728