ইরানে মহররম বা আশুরা কেবল ধর্মীয় শোকের মাস নয়। এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এক চেতনার নাম: অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান, আত্মত্যাগের আদর্শ এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক।
তবে, এবারের মহররম ইরানের ইতিহাসে সম্পূর্ণ এক ব্যতিক্রমী ও নজিরবিহীন সময়ে এসেছে। ১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইরান বহু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক সংকটের মধ্য দিয়ে মহররম পালন করলেও ২০২৬ সালের মহররমের মতো পরিস্থিতি আগে কখনো দেখা যায়নি।
এর কারণ, এই প্রথমবার ইরানের রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির সশরীরে উপস্থিতি ছাড়াই। যিনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় শহীদ হন। তার শাহাদতের পর টানা ৪০ দিনের যুদ্ধ, এরপর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর এসেছে এই শোকাবহ মহররম।
প্রতিবছর মহররমের শোকানুষ্ঠানে অত্যন্ত আবেগ নিয়ে অংশ নিতেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। কারবালা ময়দানের একেকটি মর্মস্পর্শী ঘটনা শুনে তিনি অশ্রু ঝরাতেন। গত ২০২৫ সালের ৬ জুলাই সন্ধ্যায় তেহরানের ইমাম খোমেনি হোসাইনিয়াতে তার উপস্থিতিতে আশুরার রাতের শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, আলেম-ওলামাসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিপুলসংখ্যক মানুষ তাতে অংশ নেন। সেটিই ছিল তার জীবনের সর্বশেষ মহররমের অনুষ্ঠান। এবার তিনি সশরীরে না থাকলেও মহররমের প্রতিটি মজলিসে তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করা হচ্ছে এবং তার ছবি হাতে লাখো মানুষ শোকের মিছিলে অংশ নিচ্ছেন।
এবারের মহররমের আরেকটি বিশেষ ও নজিরবিহীন দিক হলো, শহীদ নেতার শেষকৃত্য ও দাফন অনুষ্ঠান মহররম মাসেই নির্ধারণ করা হয়েছে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্মরণে গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটি ইরানজুড়ে এবং ইরাকে ছয় দিনের জানাজা ও শোকানুষ্ঠানের সময়সূচি ঘোষণা করেছে। এই কর্মসূচি পাঁচটি শহরজুড়ে অনুষ্ঠিত হবে। ৪ জুলাই তেহরানে দুই দিনের বিদায়ী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি শুরু হবে এবং ৯ জুলাই মাশহাদে (২৪ মহররম) দাফনের মাধ্যমে শেষ হবে।
তবে, আয়াতুল্লাহ খামেনির দীর্ঘদিনের অসিয়ত ও ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে তার জানাজা ও দাফনের চেয়ে মহররমের প্রথম ১০ দিনের শোকানুষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ফলে পুরো দেশ প্রথমে কারবালার শহীদদের স্মরণে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শোক পালনে অংশ নিচ্ছে; এরপর জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠিত হবে। এই সিদ্ধান্ত ইরানিদের মনে প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রতিরোধের চেতনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।